সুন্দরবনের মধু আহরণ ও প্রাণীবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
বাংলাদেশের মোট আয়তনের
প্রায় ৪.২ ভাগ এবং দেশের মোট বনভূমির ৪৪ ভাগজুড়ে সুন্দরবননের
অবস্থান। পৃথিবীর
সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
এবনে বলেশ্বর ও পশুরসহ প্রায় ৪৫০টি ছোট বড় নদ-নদীর প্লাবণভূমিতে গড়ে ওঠা ৬০১৭ কি.মি এলাকা
জুড়ে উদ্ভিদ রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির, প্রাণী
রয়েছে ৩৭৫ প্রজাতির, সরীসৃপ
রয়েছে ৩৫ প্রজাতির, স্তন্যপায়ী
রয়েছে ৪১ প্রজাতির, মাছ
রয়েছে ২১০ প্রজাতির,
চিংড়ি রয়েছে ২৪ প্রজাতির, কাঁকড়া
রয়েছে ১৪ প্রজাতির এবং
৪৩ প্রজাতির ঝিনুকসহ অগণিত প্রাণবৈচিত্র্যের মধ্যে
স্থানীয় মাঝি-জেলে,বাওয়ালী-মৌয়াল,চুনরি-মুন্ডা,মাহাতো জনগণ গড়ে তুলেছে এক ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব বননির্ভর জীবন
ব্যবস্থা।
| মধুর চাক |
সুন্দরবনের মধু পৃথিবীর এক অনন্য ভৌগলিক
ঐতিহ্য নির্দেশনা। এবনের মধু ও মোম আহরণের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বনে গড়ে ওঠেছে মৌয়ালি নামের বননির্ভর পেশা ও জীবন। সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের ঋতু
বাংলা মাসের চৈত্র থেকে শুরু হয় । মধু কাটার পাশ এবং বনে প্রবেশের জন্য
এ সময় বনবিভাগের স্থানীয় কার্যালয় থেকে স্থানীয় বনজীবীদের জন্য একটি বিএলসি পাশ দেয়া হয়। নৌকার দলের প্রধান যাকে সাজুনী বলে তার নামে
কার্যালয় থেকে বিএলসি পাশ দেয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর বন বিভাগ কর্তৃক চিহ্নিত ও অনুমোদিত বনের ভেতর থেকে
মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করে। মধু সংগ্রহের ক্ষেত্রে মৌয়ালরা বেশ কিছু নিয়ম নীতিও মেনে চলেন। অভিজ্ঞ মৌয়ালদের মতে, সুন্দরবনে তিন ধরনের মৌমাছি দেখা যায়। এর মধ্যে ফড়ৎং
মৌমাছিই বেশি চাক বানায় এবং এই
চাকের মধুই সুন্দরবনের সেরা মধু
বলে বিবেচিত। মিষ্টি স্বাদের
লালচে আভার এই মধুকে পদ্মমধুও বলে এবংমৌমাছিরা খলিশা ফুল থেকে এই মধু সংগ্রহ করে। মৌয়াল
বা বনজীবীরা বলেন, এক ফোঁটা মধু সংগ্রহ করতে একটি মৌমাছিকে প্রায় আশিটি ফুলের
কাছে যেতে হয়।
ভিন্ন ভিন্ন আকার ও বৈশিষ্ট্যের শ্বাসমূল যেমন ম্যানগ্রোভ বনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেমনি তা মৌমাছিদের চাক বানানোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসমূল গাছের ছড়ানো ঝোপের মত শ্বাসমূলে অনেক সময় মৌমাছি চাক বানায়,কারণ এ গাছের ছড়ানো ঝোপে তৈরি করে সেখানকার পরিবেশ অনেকটা ঠান্ডা থাকে এবং আড়াল থাকে। মৌয়ালদের মতে, এরকম পরিবেশই মৌমাছির
জন্য বেশি পছন্দ।
মধু আহরণ-
মৌমাছি মাঘ মাস থেকে
শুরু করে সুন্দরবন এলাকায় আসতে শুরু করে এবং মধুচক্রের পর
আষাঢ় মাসে আবার চলে যায়। বনে
ফুল ফোটার ঋতুতে মৌমাছিরা টের পায় এবং
বসন্তকালে ঝাঁক বেঁধে ফুল ফোটার ঋতুতে সুন্দরবনে চলে আসে। মৌয়ালদের মতে, একটি চাকে একটি রাণী মৌ পোকা থাকে এবং একে ঘিরে অনেক শ্রমিক মৌপোকা
থাকে ।
শ্রমিক মৌপোকারা প্রতিদিন নতুন নতুন মধু উৎসের সন্ধানে যায়। চাকে ফেরার পর তারা উপর-নিচ, ডান-বাম নাচের মাধ্যমে চাক থেকে মধু উৎসের দূরত্ব চিহ্নিত করে। তবে প্রত্যেকে নমুনা মধু সাথে করে নিয়ে আসে। চাকের অপেক্ষাকৃত দায়িত্বপ্রাপ্ত মৌপোকারা সিদ্ধান্ত নেয় কোন মধু উৎস থেকে মধু সংগ্রহ করা হবে। মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক দূরত্বের পথ হলে মৌমাছি কাহিল হয়ে পড়ে, অনেকে মারা যায়, অনেকে দলছুট হয়ে যায়, অনেকে আবার অন্য চাকের অর্ন্তভূক্ত হয়ে পড়ে। বনজীবীরা ‘ভারী পোকা’ মৌমাছি বলতে মধুগ্রন্থি যখন তার মধু রসে পূর্ণ থাকে। মধুগ্রন্থি পোকা ধীরগতিতে ওড়ে এবং ডানে-বামে না গিয়ে বরং সোজা মৌচাকের দিকে ওড়তে থাকে। বনজীবীরা মধুগ্রন্থি পোকার চলন এবং গতিপথ দেখে তার পিছন পিছন গিয়ে মৌচাকের সন্ধান করেন।
সুন্দরী গাছের ফুল থেকে মৌমাছি মধু রস সংগ্রহ না করলেও চাক রক্ষার উপাদানের জন্য এই ফুলের রেণু সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ করা হয়। চাকে মধু জমা করার পর বাইরে যাতে না পড়ে যায় তার জন্য মৌমাছিরা সুন্দরী গাছের ফুলের পরাগরেণু দিয়ে মুখগুলো ঢেকে দেয় হয়।
| মধুর চাক |
সুন্দরবনকে আনুভূমিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়। নিচু স্তর, মধ্যম স্তর এবং উঁচু স্তর। বনের মধ্যম ও উঁচু স্তর থেকেই মৌমাছিরা বেশি মধু সংগ্রহ করে। ম্যানগ্রোভ বনে উদ্ভিদ প্রজাতি বৈচিত্র্য বৃক্ষের সংখ্যা বেশি এবং লতা-গুল্ম ও ঘাস জাতীয় তৃণের পরিমান তুলনামূলকভাবে কম। যেকোনো মৌমাছি বৃক্ষের পরাগায়ণে বেশি ভূমিকা পালন করে থাকে। অধিকাংশ মৌমাছি বনের মধ্যম ও উঁচু স্তরে বেশি বিচরণ করে এবং বনের সবচেয়ে বৃক্ষের ফুল এ দুটি স্তরেই থাকে। বনের মৌমাছি মধুরস ও ফুলের পরাগ খেয়ে বেঁচে থাকে।
| মধুর চাক |
সুন্দরবনের খলিশার মধু বেশি পাওয়া যায়, তারপর গেওয়ার মধু এবং পরবর্তীতে বাইন ও কেওড়ার মধু পাওয়া যায়। ১৯৮৫ সনে এক সের মধুর দাম ছিল ৭০ টাকা বর্তমানে মৌয়ালরা প্রতি কেজি খলিশার মধু ২০০-২৫০ টাকা বিক্রি করলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এক কেজি মধু ৪০০ টাকা করে বিক্রি করে।
মধু আহরণের সময় বাড়ির পুরুষেরা যখন বনে থাকে তখন নারীরা কিছু নিয়ম পালন করেন। নারীরা এ সময় চুলায় মরিচ পোড়ান না, মাথায় তেল-সাবান ব্যবহার না
করা। নারীরা দুপুরবেলা কোনোভাবেই চুলায় আগুন জ্বালায় না। তারা বিশ্বাস করেন বাড়িতে এ সময় আগুন জালালে বন এবং মধুর চাকের ক্ষতি হতে
পারে।
মধু সংগ্রহের সময় মৌয়ালিরা বলে মৌয়ালরাই বাঘের আক্রমণের শিকার হন সবচেয়ে বেশি কারন, মৌচাক খোঁজার সময় মৌয়ালদের দৃষ্টিটা উপরের দিকে থাকে। হেন্তালপাতা দিয়ে কারু বানিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয় চাক থেকে মৌমাছিদের তাড়ানো। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা বড় মুখের পাত্রে মধু সংরক্ষণ করা হয় যাতে মধুর জলীয়বাষ্প উড়ে না যায়।
সুন্দরবনের উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির ও প্রাকৃতিক পরাগায়ণের জন্য মৌমাছি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অনেকে সঠিক নিয়মনীতি মেনে মধু সংগ্রহ করে না। অনেকে পুরো চাক কেটে ফেলে এবং কেউ কেউ চাকে আগুন দেয় তাতে বাচ্চা মৌপোকারা পুড়ে মারা যায়। অনেকে বনের গাছ কেটে ফেলে। যা সার্বিকভাবে কেবলমাত্র মৌমাছি-মধু নয় বর্তমানে বনজীবীদের জীবনকেই নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ছে, তাপমাত্র বাড়ছে
ও বৃষ্টিপাত কমে গেছে
এবং আবহাওয়াগত এ পরিবর্তনের ফলে সিডর এবং আইলার
পর বনজীবীদের ধারণা
মধুর পরিমাণ কমেগেছে এবং
মৌমাছিদের আচরণগত পরিবর্তনও ঘটেছে। জলদস্যু ও ডাকাত
সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের আরেকটি প্রধান সমস্যা।